মেঘ দেখলেই অন্যের ঘরে আশ্রয়, দুর্বিষহ জীবন ডালিম বেগমের

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে আকাশে মেঘ দেখলেই ঘরের সবাই অন্যের বাড়িতে চলে যাই। আর আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসের বেশির ভাগ সময়ই প্রতিবেশীর ঘরে আশ্রয় নিয়ে থাকতে হয়। স্বামী অসুস্থ, সংসারে উপার্জন করার মতো কেউ নেই। সরকারি খাদ্য সহায়তা আর মানুষের দান-অনুদানেই আল্লাহ যেভাবে চালান, সেভাবেই বেঁচে আছি।
বিজ্ঞাপন
কথাগুলো বলতে বলতে বারবার চোখ ভিজে ওঠে ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা ডালিম বেগমের। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অসুস্থ স্বামী, ছোট দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
ডালিম বেগমের স্বামী কবির ঢালী একসময় দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান নিয়ে তাদের সংসার মোটামুটি স্বচ্ছলই ছিল। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভালোভাবেই চলছিল জীবন। কিন্তু ১৩ বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারান কবির ঢালী। স্বামীর চিকিৎসার জন্য পরিবারের সব জমিজমা বিক্রি করেও তাকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ডালিম বেগম বলেন, এখন তিনি আধামরা অবস্থায় বেঁচে আছেন। ১৩ বছর ধরে অসুস্থ স্বামীর সেবা করছি। দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে এমন কষ্টে আছি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
তার বসতঘরটি এখন প্রায় বসবাসের অনুপযোগী। ভাঙাচোরা টিনের চাল ও বেড়া দিয়ে কোনোভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরটিতে বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। ঘরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই ঘুমানোর মতো একটি চৌকি। বাধ্য হয়ে মাটির মেঝেতেই অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে রাত কাটাতে হয়।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে না পারায় প্রায় এক যুগ আগে তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর আর নতুন করে সংযোগ নেওয়ার সামর্থ্য হয়নি।
বিজ্ঞাপন
ডালিম বেগম বলেন, বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। তখন নিজের ঘরে থাকা যায় না। প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। মাটিতে ঘুমানোর কারণে ঠান্ডাজনিত রোগ লেগেই থাকে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে প্যারাসিটামল এনে খাইয়ে কোনোভাবে সুস্থ রাখি।
সরকারি সহায়তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেম্বার সাহেব আমাদের একটা কার্ড করে দিয়েছেন, তাতে চাল পাই। এক বান ঢেউটিনও দিয়েছেন। কিন্তু এতটুকু দিয়ে তো পুরো ঘর মেরামত করা সম্ভব না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মঞ্জুর শরীফ জানান, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করার পাশাপাশি স্থানীয়দের কাছ থেকেও সহায়তা সংগ্রহ করে দিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সরকারি চাল, এক বান ঢেউটিন এবং তিন হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, তাদের ঘরের অবস্থা খুবই খারাপ। কয়েক বান ঢেউটিন প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরা খাবার জোগাড় করবে, নাকি ঘর মেরামত করবে—এই দুশ্চিন্তাতেই দিন কাটছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের মতে, বর্ষা এলেই ডালিম বেগমের পরিবারের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাদের জন্য একটি নিরাপদ বসতঘর ও নিয়মিত জীবিকার ব্যবস্থা করা গেলে পরিবারটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মেহেদী হাসান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা খোঁজখবর নেব। যাচাই-বাছাই শেষে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।








