Logo

সুগন্ধার ভাঙনে কবরও বিলীন, দাফনের জায়গা নিয়েও আতঙ্ক নদীপাড়ে

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
ঝালকাঠি
২০ জুলাই, ২০২৬, ১৭:০৯
সুগন্ধার ভাঙনে কবরও বিলীন, দাফনের জায়গা নিয়েও আতঙ্ক নদীপাড়ে
ছবি: প্রতিনিধি

আমার স্বামীর কবরটাও নদীতে চলে গেছে। এখন মানুষ মরলেও কোথায় কবর দেব, সেই চিন্তায় থাকতে হয়। কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই গ্রামের ৭০ বছর বয়সী মাকসুদা বেগম।

বিজ্ঞাপন

সুগন্ধা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে শুধু তাঁর বসতভিটাই নয়, নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে স্বামীর কবরও। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রিয়জনদের দাফনের স্থান নিয়েও গভীর উদ্বেগে রয়েছেন তিনি।

একসময় নদীর তীরঘেঁষে ছিল মাকসুদা বেগমের পৈতৃক বাড়ি। নদীভাঙনে সেটি হারিয়ে যাওয়ার পর ছেলেরা কিছুটা দূরে নতুন করে ঘর নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু সুগন্ধার অব্যাহত ভাঙন সেই আশ্রয়ও কেড়ে নিয়েছে। শেষ সম্বল বসতভিটা, গাছপালা ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়ার পর বর্তমানে অন্যের জমিতে ছোট্ট একটি ঘর তুলে কোনোমতে বসবাস করছেন তিনি। তার অভিযোগ, এত বড় ক্ষতির পরও কোনো সরকারি সহায়তা বা খোঁজখবর পাননি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ধরে চলমান সুগন্ধা নদীর ভাঙনে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার অন্তত ১০টিরও বেশি গ্রামের শত শত পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। বর্ষা এলেই নদীতীরের মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। প্রতিটি রাত কাটে এই আশঙ্কায়—সকালে ঘুম ভাঙার পর ঘরটি আদৌ থাকবে কি না।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বারইকরন, সরই, তিমিরকাঠি, দরিরচর, খোজাখালী, মল্লিকপুর, সিকদারপাড়া, বহরমপুর, ষাটপাকিয়া, কাঠিপাড়া ও অনুরাগসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে বারইকরন, সরই, খোজাখালী, দরিরচর, তিমিরকাঠি ও সিকদারপাড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

সরই গ্রামের বাসিন্দা রশিদ মোল্লা বলেন, প্রায় পাঁচ দশক ধরে নদীভাঙন চললেও কার্যকর কোনো স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ সময়ে অসংখ্য পরিবার বসতভিটা, পানের বরজ, গাছপালা এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদ হারিয়েছে। তার ভাষায়, প্রতি বছর মানুষ নিঃস্ব হলেও নদীশাসনের নামে আশ্বাস ছাড়া বাস্তবে তেমন কিছুই দেখা যায়নি।

হেপী বেগম জানান, তার বসতঘর এখন নদীর একেবারে কিনারায়। প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হয়, কখন ঘরটি নদীতে তলিয়ে যায়। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার।

বিজ্ঞাপন

মগড় ইউনিয়নের কাঠিপাড়া গ্রামের ইউসুফ হাওলাদার বলেন, একসময় তাদের এলাকায় ২০ থেকে ৩০টি পরিবার বসবাস করলেও এখন মাত্র দুই-তিনটি পরিবার টিকে আছে। তিনি বলেন, "আমরা কোনো সাহায্য চাই না, শুধু নদীভাঙন বন্ধের স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।

সরই গ্রামের জামাল ফকির জানান, তার বাপ-দাদার ভিটা এখন সুগন্ধা নদীর মাঝখানে। অনেক কষ্টে নতুন বাড়ি করলেও সেটিও এখন ঝুঁকির মুখে।

অবসরপ্রাপ্ত তহসিলদার হাজী আব্দুল হক তালুকদার বলেন, যেখানে একসময় অসংখ্য মানুষের বসতি ছিল, সেখানে এখন লঞ্চ চলাচল করছে। নদী ধীরে ধীরে তার বাড়ির দিকেও এগিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত নিজের ভিটায় থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সরই গ্রামের ইউপি সদস্য বেল্লাল হোসেন মোল্লা জানান, নদীভাঙনে এলাকার অনেক মানুষ বাপ-দাদার ভিটার শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হলেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা বলেন, ঝালকাঠি ও নলছিটি উপজেলার নদীভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন করে যেসব এলাকায় ভাঙন বেড়েছে, সেগুলোরও প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও জানান, নদীর গতিপ্রকৃতি, পানির প্রবাহ ও ভাঙনের ধরন বিবেচনায় নিয়ে কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে স্থায়ী নদীশাসনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।

নদীপাড়ের মানুষের কাছে সুগন্ধা নদীর ভাঙন এখন শুধু জমি হারানোর ঘটনা নয়; এটি শেকড়, স্মৃতি, পূর্বপুরুষের কবর এবং প্রজন্মের পরিচয় হারানোর বেদনাদায়ক ইতিহাস। তাদের একটাই দাবি—প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত ও কার্যকর নদীশাসনের বাস্তবায়ন। কারণ তাদের ভাষায়, "ভিটেমাটি হারালে আবার ঘর তোলা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, পূর্বপুরুষের কবর আর শেকড় কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD