Logo

আট কোটি টাকার শান্তি নিবাস তিন বছরেও খুলল না প্রবীণদের জন্য

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
লালমনিরহাট
৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫:৪৬
আট কোটি টাকার শান্তি নিবাস তিন বছরেও খুলল না প্রবীণদের জন্য
ছবি: সংগৃহীত

অসহায়, অবহেলিত ও আশ্রয়হীন প্রবীণ নারীদের জীবনের শেষ সময়ে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে লালমনিরহাটে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘শান্তি নিবাস’। ৬০ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন নারীর থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রায় ৮ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় আধুনিক বহুতল ভবনটি। অথচ নির্মাণ শেষে প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও একজন প্রবীণ নারীর জন্যও খুলে দেওয়া হয়নি এর দরজা। জনবল সংকটে তালাবদ্ধ ভবনটি এখন বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি অর্থে নির্মিত এই আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে মূল্যবান আসবাবপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য অবকাঠামো। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে সংযোগ। ফলে রাত নামলেই অন্ধকারে ডুবে থাকে পুরো ভবন।

লালমনিরহাট শহরের বালাটারি এলাকায় সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) প্রাঙ্গণে ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট শান্তি নিবাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ৮ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

২৫ প্রবীণ নারীর জন্য আধুনিক আবাসনের ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন

শান্তি নিবাসে ৬০ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন নারীর থাকার উপযোগী করে ২৫টি আধুনিক শয়নকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে উন্নত ডাইনিং সুবিধা, লিফট, শরীরচর্চার জন্য জিমনেসিয়াম এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আশ্রয়হীন ও অসহায় প্রবীণ নারীরা এখানে নিরাপদে বসবাসের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কিন্তু জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এতসব আয়োজন কোনো কাজেই আসছে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় মূল্যবান সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বকেয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা, নেই বিদ্যুৎ সংযোগ

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা বকেয়া থাকায় ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ফলে রাতে পুরো ভবন অন্ধকারে থাকে।

এ ছাড়া লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে। দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি ব্যবহার না হওয়ায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে ভবনটির আনুষ্ঠানিক দেখভালের দায়িত্বে নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান নেই। তবে একই প্রাঙ্গণে সরকারি শিশু পরিবার থাকায় মানবিক বিবেচনায় ভবনটির খোঁজখবর রাখছেন সেখানকার কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক মোসাম্মৎ হাওয়া খাতুন বলেন, কবে নাগাদ ভবনটি চালু হবে, তা তিনি বলতে পারবেন না। ভবনটির আনুষ্ঠানিক দেখভালের দায়িত্বও তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ওপর নেই। তবে একই চত্বরে অবস্থিত হওয়ায় তিনি নিজ উদ্যোগে সেটির খোঁজখবর রাখেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, ভেতরের আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র এখনো মোটামুটি ভালো রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় রাতে পুরো ভবন অন্ধকারে থাকে।

দ্রুত চালুর দাবি স্থানীয়দের

বিজ্ঞাপন

প্রায় তিন বছর ধরে নতুন ভবনটি অব্যবহৃত পড়ে থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, যে প্রবীণ নারীদের কল্যাণে এত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তাঁরাই এখনো এই প্রতিষ্ঠানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

স্থানীয় শিক্ষক মাহফুজ রহমান বলেন, তিন বছর আগে শান্তি নিবাসের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরঞ্জামও রয়েছে। কিন্তু যেসব প্রবীণ নারীর জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে, তাঁরা এখনো সেখানে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন না। দ্রুত জনবল নিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করে জেলার অবহেলিত বৃদ্ধাদের এখানে বসবাসের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

সাংবাদিক খোরশেদ আলম সাগর বলেন, মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। অথচ উদ্বোধনের পর থেকেই এটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ব্যবহার না হওয়ায় আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন। জনকল্যাণে নির্মিত একটি প্রতিষ্ঠানের এমন পরিণতি দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

লালমনিরহাট কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম লিটন বলেন, জেলায় শান্তি নিবাস চালু করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, অনেক অসহায় বৃদ্ধাকে রাস্তাঘাটে মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখা যায়। তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত চালু করতে হবে। এ উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি জনসাধারণের কোনো উপকারে আসবে না।

জনবল নিয়োগের অনুমোদন, কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল হক জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে আটটি শান্তি নিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। লালমনিরহাটের প্রতিষ্ঠানটি সেগুলোর একটি।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বুঝে নেওয়া হয়। কিন্তু জনবলের পদ সৃষ্টি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

তবে এ বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানিয়ে ফজলুল হক বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গেছে। নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নিয়োগ সম্পন্ন হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে দ্রুত শান্তি নিবাস চালু করা সম্ভব হবে।

প্রায় ৮ কোটি টাকার এই প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন জেলার অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণ নারীরা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জনবল নিয়োগসহ প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে ভবনটির দরজা খুলে দেওয়া হবে। অব্যবহৃত অবকাঠামোকে কার্যকর করে প্রবীণ নারীদের জন্য নিশ্চিত করা হবে নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD