যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সংকট, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওপর খেপলেন ট্রাম্প

ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অস্ত্রের মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগ তুলে হেগসেথের কাছে ব্যাখ্যা চান ট্রাম্প।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নিয়ে দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, ট্রাম্প মনে করেছিলেন দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির বিষয়টি ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রভান্ডারে সংকট তৈরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রায় ৫০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এসব অস্ত্রের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের মুখে হেগসেথ তার ডেপুটি স্টিফেন ফেইনবার্গের দিকে দায় ঠেলে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে হোয়াইট হাউস এমন ঘটনার কথা অস্বীকার করেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট দাবি করেছেন, এ ধরনের প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেলও অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, হেগসেথ গোলাবারুদের মজুত সম্পর্কে কাউকে বিভ্রান্ত করেননি এবং ডেপুটি সেক্রেটারিকে দায়ীও করেননি। অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়া কিংবা ইরান ইস্যুতে মন্ত্রীর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের খবরও তিনি কাল্পনিক বলে দাবি করেন।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজেও অস্ত্রের মজুত নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে কথা বলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে বলে দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মজুত কমে যাওয়ার খবর নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এমন তথ্য ছড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। তবে অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট মজুতের পরিমাণ তিনি জানাননি।
বিজ্ঞাপন
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ইরান যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, প্রকাশ্যে ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যুদ্ধের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা বললেও বাস্তবে পরিস্থিতি নিয়ে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়েও প্রশাসনের মধ্যে মতৈক্যের অভাব রয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ইরানকে আলোচনায় রাজি করাতে এতটা সময় লাগবে বলে ধারণা করেননি। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও তা অর্জনের বাস্তব কৌশল নিয়ে শুরু থেকেই স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না বলেও ওই ব্যক্তি দাবি করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
তবে ট্রাম্পের মেজাজ হারানোর খবর অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস। ক্যারোলিন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্টের একটি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত দল রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা, নাকি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি ধ্বংস করা—কোন লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট না হওয়ায় যুদ্ধের শেষপর্যায়ের পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ওই মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেন।
তার ভাষ্য, স্পষ্ট নীতিগত নির্দেশনা না থাকলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী নতুন করে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামরিকভাবে একাধিক সাফল্য অর্জিত হলেও যুদ্ধ কীভাবে এবং কোথায় শেষ হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত না থাকলে তা শেষ পর্যন্ত কৌশলগত পরাজয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে পেন্টাগন বলছে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ, সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল কুপার এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান কেইন ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক অভিযান নিয়ে ঐক্যবদ্ধ বলেও দাবি করা হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার হুমকি একাধিকবার দিলেও ট্রাম্প পরে তা স্থগিত করেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করার পথ তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে এবং পরিস্থিতি ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তবে আগের আলোচনাগুলোও শেষ পর্যন্ত সংঘাতের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবারের আলোচনার ফল কী হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার হুমকির বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, সেটি কেবল কথার কথা ছিল না; প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল এবং এখনো রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে ইরান জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা হয়নি। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে তেহরান। এ ধরনের সমঝোতা যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
প্রায় এক মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকার এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরান জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ছিল হরমুজ প্রণালি।








