Logo

সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা পর ট্রান্সফার অব প্রপার্টি বিল পাস

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২১:২৯
সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা পর ট্রান্সফার অব প্রপার্টি বিল পাস
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের পর ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। বিলটি নিয়ে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। বিশেষ করে সন্তানের নামে সম্পত্তি নিবন্ধনের পর বাবা-মায়ের আজীবন ভোগদখল ও নিরাপত্তার বিধানকে কেন্দ্র করে মুসলিম পারিবারিক আইন, শরীয়তের ফারায়েজ, হেবা ও উত্তরাধিকার বিধির সঙ্গে সম্ভাব্য সাংঘর্ষিকতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

বিজ্ঞাপন

তবে আইনমন্ত্রী ও বিলের সমর্থক সংসদ সদস্যরা বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যমান হেবা কিংবা শরীয়াহভিত্তিক সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর দাবি জানান। কিন্তু সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে গেলে বিরোধী দল কয়েক মিনিটের জন্য সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

বিলটির আলোচনায় অংশ নিয়ে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মোমেন বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি কোরআন ও সুন্নাহর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর মতে, সম্পত্তি দানের পরও দাতার আজীবন ভোগদখল বজায় রাখার সুযোগ সৃষ্টি হলে আল্লাহ নির্ধারিত মিরাসি বিধান পাশ কাটানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরীয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্টের মূলনীতিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বাবা-মায়ের শেষ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এ জন্য ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করেই সমাধান করা সম্ভব। ইসলামী পারিবারিক আইনের কাঠামো পরিবর্তন করে এর সমাধান করা উচিত নয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে বিলটির মানবিক উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্থন জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, অনেক বাবা-মা শেষ বয়সে সন্তানের অবহেলার শিকার হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বাধ্য হন। তবে আইনটিতে আরও কিছু সুরক্ষা যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি প্রস্তাব করেন, সন্তান বাবা-মাকে অবহেলা করলে দাতা যেন এককভাবে দলিল বাতিলের আবেদন করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা উচিত। একই সঙ্গে সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ বন্ধ করার পাশাপাশি পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করেন তিনি।

কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালও বিলটির মানবিক দিককে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, অনেক সন্তান বাবা-মায়ের সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর তাদের শেষ বয়সে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখে। তাই বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনটিকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।

তবে ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান বিলটিকে শরীয়তের ওপর কৌশলী আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৮৮২ সালের পুরোনো আইন সংশোধনের নামে মানবাধিকার ও সমতার বিষয় সামনে এনে মুসলিম পারিবারিক আইনের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কয়েকজন সন্তানের অনিয়মের কারণে ইসলামী পারিবারিক আইনকে প্রভাবিত করা সমীচীন নয়।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে দেশের ইসলামিক স্কলারদের আপত্তি রয়েছে। তাই বিলটি আরও বিস্তারিত পর্যালোচনা করে জনমত যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল আলিম বলেন, আবেগ বা মানসিক চাপের কারণে অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের কাছে নিজেদের সম্পত্তি লিখে দিয়ে পরে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে ইসলামী নীতিতে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি দানের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, বিলটি ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা থাকায় আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে জনমত যাচাইয়ের জন্য এটি পাঠানো উচিত।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য সম্পত্তির বাস্তব দখল বা ‘কব্জা’ হস্তান্তর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কাগজে মালিকানা হস্তান্তরের পরও দাতা যদি সম্পত্তির দখল নিজের কাছে রাখেন এবং মৃত্যুর পর তা কার্যকর হয়, তাহলে সেটি হেবার প্রচলিত কাঠামোকে পরিবর্তন করতে পারে। এর মাধ্যমে প্রকৃত উত্তরাধিকারীরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে তিনি বিলটির বিষয়ে জনমত নেওয়ার দাবি জানান।

বিজ্ঞাপন

পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আজগার বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনটি শরীয়তের মিরাজ, ফারায়েজ ও ওসিয়ত সংক্রান্ত বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও আলেম-ওলামাদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ২০ অক্টোবরের মধ্যে বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের দাবি করেন।

চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মানবিক উদ্দেশ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ধর্মীয় মূলনীতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার সময়ে তাড়াহুড়া না করে ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে আইনটি চূড়ান্ত করার পক্ষে মত দেন তিনি। তিনিও ২০ অক্টোবর পর্যন্ত জনমত যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, কিছু সন্তানের অপরাধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদ্যমান পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন কার্যকর করাই যথেষ্ট ছিল। পারিবারিক ও ধর্মীয় আইনের মূল কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হলে সাধারণ মানুষ নতুন ধরনের আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। তাই আইনটি পাসের আগে জনমত যাচাই জরুরি।

বিজ্ঞাপন

পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কোরআন-সুন্নাহর বিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো আইন প্রণয়ন করা হলে তা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। তিনি বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ফতোয়া বোর্ড ও ওলামায়ে কেরামের পরামর্শ নেওয়ার জন্য পাঠানোর আহ্বান জানান।

বিতর্কের পর বিরোধীদলীয় নেতা ও ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ড. মো. শফিকুর রহমান বলেন, বাবা-মায়ের নিরাপত্তার মতো মানবিক বিষয় সামনে রেখে আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর কিছু বিধান ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সূরা নিসার মিরাস সংক্রান্ত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ইসলামী বিধান অনুযায়ী হেবা বা উইলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে এবং সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগদখলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ওসিয়তের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। বর্তমান বিলে এসব বিষয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হলে প্রকৃত হকদাররা বঞ্চিত হতে পারেন এবং সামাজিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তিনি বিলটি এই অধিবেশনে পাস না করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও শরীয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে পুনরায় পর্যালোচনার দাবি জানান।

তবে সংসদে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত বিলের ১২২অ ধারার সাব-সেকশন ৪ অনুযায়ী এই হস্তান্তর সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি বিদ্যমান হেবা, সাধারণ দান কিংবা শরীয়াহ আইনের অধীনে সম্পন্ন হওয়া অন্য কোনো হস্তান্তর দলিলের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন বা সীমিত করবে না।

আরও পড়ুন

আইনমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সেল, মর্গেজ, লিজ, এক্সচেঞ্জ ও গিফট—এই পাঁচ ধরনের হস্তান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাধারণ গিফটের একটি পৃথক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা হেবা থেকে আলাদা। ফলে হেবা ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয় ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ীই কার্যকর থাকবে।

শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের আপত্তি ও জনমত যাচাইয়ের দাবি নাকচ হওয়ার পর কণ্ঠভোটে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ সংসদে পাস হয়।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD