Logo

মোদী সরকারের পতনের কারণ কি দম্ভ?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ আগস্ট, ২০২৬, ১৭:০৩
মোদী সরকারের পতনের কারণ কি দম্ভ?
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের ওপর। দুই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিল মোদীর দল বিজেপি। ফলে সরকার গঠনে তাদের জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বিজ্ঞাপন

তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেছিলেন, মোদীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে ধাক্কা লেগেছে। যদিও পরবর্তী রাজ্য নির্বাচনগুলোতে বিজেপি আবারও ঘুরে দাঁড়ায় এবং বিরোধীদের পরাজিত করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে মোদী সরকারের নেতৃত্ব ও নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকারকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় গত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মোদী সরকারের গত ১২ বছরের শাসনামলে কোনো মন্ত্রীর এভাবে পদত্যাগের ঘটনা বিরল। গত তিন বছরে মেডিকেল কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষা নিয়েও দুই দফায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ক্ষতিপূরণ ও কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণা

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ আমলাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার ৪৭ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন একটি বিলও আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স তৈরির ঘোষণাও এসেছে।

তবে সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপের বাইরে সরকারের মধ্যে গভীর আত্মসমালোচনার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। ফলে অতীতের ভুল স্বীকার না করার নীতি থেকে সরকার এখনো সরে আসেনি বলেই মনে করছেন অনেকে।

পদত্যাগ করেও দায় নেননি ধর্মেন্দ্র

বিজ্ঞাপন

পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান পুরো ঘটনার দায় নিজের ওপর নেননি। বরং তিনি দাবি করেন, কিছু অসাধু গোষ্ঠী পরীক্ষা ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছে।

পার্লামেন্টেও তিনি বিষয়টিকে খুব বড় সংকট হিসেবে দেখাতে চাননি। এমনকি পদত্যাগের পর সংসদ ভবনে মিত্রদের কাছ থেকে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়।

পুরোনো উদ্যোগেই নতুন মোড়ক?

বিজ্ঞাপন

পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে মোদী সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের দাবি, সম্প্রতি গঠিত টাস্কফোর্সটি ২০২৪ সালে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটিরই পুনরাবৃত্তি। একইভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর শাস্তির জন্য আনা বিলটিকেও আগের আইনের নতুন সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব এমন একজনের হাতে দেওয়া হয়েছে, যিনি একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ভোক্তা বিষয়ক ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এক ব্যক্তির হাতে থাকায় শিক্ষা খাতকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও সমালোচনা

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা হয়েছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। মধ্য দিল্লির বিক্ষোভস্থলের আশপাশে কয়েক দিন মোবাইল ইন্টারনেট সেবা সীমিত রাখার অভিযোগও ওঠে। পাশাপাশি একটি পিয়ার-টু-পিয়ার মেসেজিং অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মোদীবিরোধী পোস্ট সরিয়ে নেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। সরকারি শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কথাও সামনে এসেছে।

তরুণদের কাছে পৌঁছাতে মোদীর নতুন কৌশল

বিজ্ঞাপন

চলমান সংকটের মধ্যেই তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কৌশল নিয়েছে সরকার। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ইনস্টাগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় এই প্ল্যাটফর্মে গত ২৩ জুলাই মোদী প্রথমবার একটি রিল প্রকাশ করেন।

ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রল ও হাস্যরসের জন্ম দেয়। তবে সরকারপন্থী গণমাধ্যমগুলোর দাবি ছিল, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি সর্বোচ্চ ভিউয়ের রেকর্ড গড়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

মোদী তার মন্ত্রীদেরও তরুণদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি এক সংসদ সদস্যকে পার্লামেন্টে তরুণদের ব্যবহৃত ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

তরুণদের ভাষায় এ ধরনের কৌশলকে অনেকেই ‘অরা ফার্মিং’ হিসেবে দেখছেন—অর্থাৎ প্রকৃত জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে কৃত্রিমভাবে আকর্ষণ তৈরির চেষ্টা।

সামনে কঠিন পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা দিয়ে বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, নরেন্দ্র মোদী এই সংকট মোকাবিলা করে তার আগের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারবেন কি না। নাকি সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ ও আস্থার সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD