ভারতের কৃষিপণ্যে আস্থা হারাচ্ছে একের পর এক দেশ, নেপথ্যে কী?

ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে একের পর এক বাধা তৈরি হচ্ছে। জাপানে ভারতীয় আমের আমদানি সাময়িক বন্ধ হওয়ার পর চীন ভারতীয় কয়েকটি চাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছে। একই সময়ে হংকং ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতীয় মসলা পণ্যের ওপরও নজরদারি বাড়িয়েছে। এসব ঘটনায় ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানির মান, খাদ্যনিরাপত্তা, পরীক্ষাব্যবস্থা ও পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
ভারতের সবচেয়ে ব্যস্ত কৃষিপণ্য রপ্তানি মৌসুম সামনে রেখে উত্তর প্রদেশের লখনৌর রেহমানপুর গ্রামের একটি কারখানায় আম ও সবজি জীবাণুমুক্তকরণের কাজ চলছিল। মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের কৃষকেরাও জাপানে পাঠানোর জন্য আলফানসো ও কেসর আম প্রস্তুত করছিলেন। রপ্তানির কাগজপত্র প্রস্তুত ছিল এবং জাহাজে পাঠানোর সময়সূচিও নির্ধারিত হয়েছিল। এর মধ্যেই জাপানের কোয়ারেন্টিন পরিদর্শকেরা ভারতে পরিদর্শনে আসেন।
গত মার্চে তাদের সফরের পর পুরো প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। আম জীবাণুমুক্তকরণ, পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে জাপান। এর পর ভারত থেকে আম আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় দেশটি।
জাপানের বাজারে ভারতীয় আমে স্থগিতাদেশ
বিজ্ঞাপন
৩১ মার্চ ভারতের উদ্ভিদ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় জাপানের ইয়োকোহামা কর্তৃপক্ষ। সেখানে জানানো হয়, ২৫ মার্চ বা এর পর ইস্যু করা পরিদর্শন সনদযুক্ত ভারতীয় আমের চালান গ্রহণ করা হবে না।
জাপানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর কার্যক্রম নির্ধারিত মানদণ্ডে ফিরেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পর আমদানি পুনরায় শুরু করা হবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রায় দুই দশক পর ভারত-জাপান আম বাণিজ্যে এমন বড় বাধা দেখা দিয়েছে। এর আগে ১৯৮৬ সালে ফলমাছির ঝুঁকির কারণে ভারতীয় আমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল জাপান। ২০০৬ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। সে সময় ভারত ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট বা ভিএইচটি অবকাঠামো তৈরি করে। একই সঙ্গে কীটপতঙ্গ পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং নিয়মিত পরিদর্শনের বিষয়ে সম্মত হয়।
জাপানের বাজার কেন গুরুত্বপূর্ণ
২০২৬ সালের স্থগিতাদেশে ভারতের ছয় জাতের আম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো হলো—আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বানগানাপল্লি, চৌসা ও মাল্লিকা।
বিজ্ঞাপন
ভারতের আম রপ্তানির প্রধান সময় এপ্রিল থেকে জুন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপান ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম আমদানি করেছিল।
পরিমাণের দিক থেকে এই বাজার ভারতের সবচেয়ে বড় না হলেও রপ্তানিকারকদের কাছে জাপানের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, জাপানি বাজারে সাধারণত উচ্চমানের আমের জন্য বেশি দাম পাওয়া যায়। একই সঙ্গে জাপানের বাজারে প্রবেশের অনুমোদন অন্য আন্তর্জাতিক বাজারেও ভারতীয় পণ্যের মান নিয়ে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
মুম্বাইয়ের আম রপ্তানিকারক বিক্রম শাহ বলেন, পরিমাণের হিসাবে জাপান তাদের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল না। তবে এই বাজার তাদের পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে তাঁর ছয় বছর সময় লেগেছে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
জাপানের বাজারের জন্য বড় বিনিয়োগ কৃষকদের
মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির আমচাষি রাজেশ পাতিলের পরিবার দুই প্রজন্ম ধরে কোকণ উপকূলে আম চাষ করছে। জাপানের বাজারে ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় তিনি বাগান ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছিলেন।
জাপানের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে গ্রেডিং ও হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার পাশাপাশি কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণও নেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
পাতিলের দাবি, স্থানীয় বাজারের তুলনায় জাপানের বাজারে প্রায় দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব হতো। সে কারণে রপ্তানি ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য থাকবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁদের। কিন্তু আমদানি স্থগিত হওয়ায় সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা এসেছে।
ভারতীয় চালে প্রশ্ন তুলেছে চীন
আমের পর ভারতীয় চাল রপ্তানিতেও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল চীন ভারতের তিনটি চাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের আমদানি লাইসেন্স বাতিল করে।
বিজ্ঞাপন
চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষের দাবি, ভারত থেকে পাঠানো চালের চালানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা জিএমও থাকার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, চাল পাঠানোর আগেই জিএমওমুক্ত সনদ নেওয়া হয়েছিল। ভারত সরকারও জানিয়েছে, দেশের ধান ও চাল উৎপাদনের জমিতে জেনেটিক পরিবর্তন করা ফসল নেই।
বিজ্ঞাপন
ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে চাল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি রেকর্ড প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের চাল রপ্তানি করেছে। ফলে চীনের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
পরীক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন
ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এপিডা) গত ৮ জুন চীনে রপ্তানির জন্য জিএমও পরীক্ষা করতে অনুমোদিত পরীক্ষাগারের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।
কৃষিবিজ্ঞানী এস কে সিংয়ের মতে, চীনের এই পদক্ষেপ ভারতের পরীক্ষাব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশ ও অ্যাফ্লাটক্সিন পরীক্ষায় ভারতীয় পরীক্ষাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সক্ষমতা তৈরি করলেও চীনের জিএমও যাচাইয়ের চাহিদা পূরণে আরও বিস্তৃত সক্ষমতা প্রয়োজন।
উত্তর ভারতের পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো রাজ্যের রপ্তানিকারকদের অনেক সময় নমুনা পরীক্ষার জন্য কয়েকশ কিলোমিটার দূরে পাঠাতে হয়। কারণ প্রয়োজনীয় প্রোটিন বিশ্লেষণের সক্ষমতাসম্পন্ন পরীক্ষাগারের সংখ্যা এখনো সীমিত।
মসলা রপ্তানিতেও বাড়ছে সতর্কতা
আম ও চালের পাশাপাশি ভারতীয় মসলা রপ্তানিতেও সতর্ক সংকেত দেখা দিয়েছে। পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশের কারণে হংকং ভারতের কয়েকটি মসলা পণ্যের আমদানি স্থগিত করেছে। পরীক্ষায় প্রায় ১২ শতাংশ নমুনায় মানের বিচ্যুতি পাওয়া গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভারতীয় জিরার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জিরার চালানের ৩০ শতাংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থায় ভারতীয় মসলা নিয়ে ৩১২টি সতর্কবার্তা এসেছিল।
সমস্যার মূল জায়গায় সরবরাহব্যবস্থা
খাদ্যনিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বসের মতে, ভারতের কৃষিপণ্য সরবরাহব্যবস্থা অনেকটাই খণ্ডিত। কৃষক প্রথমে পণ্য বিক্রি করেন সংগ্রাহকের কাছে। এরপর তা যায় ব্যবসায়ীর হাতে। সেখান থেকে কোনো প্রক্রিয়াজাতকারী বা রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছায়।
এই দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থায় কৃষিজমিতে কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল, সে তথ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এখন শুধু ভালো পণ্য উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। কোন জমিতে পণ্য উৎপাদন হয়েছে, কী কী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এবং কখন তা সংগ্রহ করা হয়েছে—পুরো প্রক্রিয়ার তথ্যও দেখাতে হয়।
ভারতের অনেক রাজ্যে এ ধরনের ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এখনো বাধ্যতামূলক নয়।
প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে
বিশ্ববাজারে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ও সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। থাইল্যান্ড দেশজুড়ে ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম কৃষকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ব্রাজিল ও চিলি কোল্ড-চেইন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে।
অন্যদিকে ভারতে নিবন্ধিত প্যাক হাউজের সংখ্যা মাত্র ২০৭টি। এর মধ্যে ৭২ শতাংশই মহারাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত।
কোল্ড স্টোরেজের ঘাটতি এবং পরিবহন ব্যয়ও ভারতের জন্য বড় সমস্যা। এসব খাতে রপ্তানি মূল্যের প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যয় হয়, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
উৎপাদনে শক্তিশালী, মান প্রমাণে পিছিয়ে
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪২ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত।
তবুও বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানিও প্রায় ১৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ এবং চীনে প্রায় ৫০ শতাংশ।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অনিল গুপ্তের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বেশি উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু উন্নত বাজারে এখন শুধু বেশি উৎপাদন করলেই হচ্ছে না; উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় মান বজায় রাখার প্রমাণও দিতে হয়।
তবে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে। গত এক দশকে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ৮৯ হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি সনদের সংখ্যা প্রায় ৬১ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি হয়েছে।
রপ্তানি বাধায় চাপে কৃষকেরাও
ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাধার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের ওপর। গুজরাটের কেসর আমচাষিরা জাপানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্রেতার বাজার হারিয়েছেন।
আরও পড়ুন
হরিয়ানার কারনালের এক বাসমতি ধানচাষি জানিয়েছেন, স্থানীয় বাজারে এরই মধ্যে চালের দাম ৮ শতাংশ কমেছে।
কেরালার এর্নাকুলামের এক হলুদ প্রক্রিয়াজাতকারী শুধু অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করাতেই এক প্রান্তিকে ১৫ হাজার রুপি ব্যয় করেছেন। এই খরচ তাঁর লাভের প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারতীয় কৃষকেরা বিশ্ববাজারের জন্য বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন। এখন দেশটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই পণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারকে নিয়মিতভাবে আশ্বস্ত করা।
জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো বাজারে খাদ্যনিরাপত্তা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং সনদের মান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কীটপতঙ্গের ঝুঁকি, ভোক্তাদের স্বচ্ছতার দাবি এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাড়তি চাপ।
ভারত সরকার পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কীটনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি জোরদারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষি উৎপাদক দেশ ভারতকে এখন শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, পণ্যের মান, নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু ভালো কৃষিপণ্য উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। সেই পণ্য কেন নিরাপদ ও মানসম্মত—তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণও দিতে হয়।
সূত্র: আল-জাজিরা








